রাজনীতিবিদদের চিন্তার মৌলিক পরিবর্তন আবশ্যক
২৪ এর ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে একটি ফ্যাসিস্ট, অত্যাচারী, অদেশপ্রেমিক, দুর্নীতিবাজ, লুটেরা সরকার সদলবলে পালিয়ে গিয়েছে, যারা এ দেশের একটি বৃহৎ ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল হিসেবে সক্রিয় ছিলো। তাদের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের দ্বারা বাংলাদেশের সাধারণ জনতা বিগত প্রায় দেড় দশক শোষিত এবং শাসিত হচ্ছিলো।
বর্তমানে বাংলাদেশের আরেকটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল এ মুহূর্তে নির্বাচন করলে সাধারণভাবে বোঝা যায় যে, তারাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের দল এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের আচরণও পালিয়ে যাওয়ার সরকারি দল, এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের অনুরূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র, বয়স আনুমানিক ২৩/২৪ হবে হয়তো, গণপরিবহনে আমার পাশের সিটের যাত্রী, গন্তব্যে যেতে যেতে তার সাথে কথা হচ্ছিলো। সে বললো- কিন্তু দেখুন এ দলগুলোর কর্মী সমর্থকদের মনোভাব এমন যে, তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা বললেই তারা মারমুখী আচরণ করে সাধারণ জনতার সাথে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের ব্যবহার আমাদের পছন্দ হয় না, কিন্তু আমরা এগুলো সরাসরি মুখ খুলে বলতে পারি না, কেননা পাছে তাদের দ্বারা আক্রমণের শিকার হই । অনেকটা সে ভয়ে আমার মতো অনেকেই হয়তো এমনটি করে থাকে।
ছেলেটির মন্তব্যে আমি ভাবনার রাজ্যে সাঁতার কাটা শুরু করে দিলাম। মন্দ বলেনি, সত্যিই তো আমার মাথায়ও ইদানিং প্রায়ই প্রতিনিয়ত এরকম প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ, যে কোন জায়গায় যখন আমার বয়সী বন্ধু, বান্ধবের সাথে কথা বলি, তখন ওই দলেরই সমর্থক কর্মী বা নেতা বন্ধুরা তাদের সকলে নিজস্ব যুক্তি দিয়ে জিততে চায়। কোন কথা তাদের বা তাদের দলের বিরুদ্ধে গেলে আমার সাথে রাগ করে। এমনকি ফেসবুকে কোন মন্তব্য লিখলেও যদি তাদের বিরুদ্ধে যায়, তারা বিভিন্ন রকমের শব্দ দ্বারা তখন আক্রমণ করে।
ব্যাপারটি এমন যে, একটি ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হয় আলোচনা সমালোচনায়। তাহলে কি সাধারণ জনতা তাদের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে পারবেনা? আমজনতা ঐক্যবদ্ধ নয়, তারা ক্ষেত্রবিশেষে একাকী। বিপরীতে যারা দল করে তারা ঐক্যবদ্ধ, জনতার তুলনায় তাৎক্ষণিকভাবে সংখ্যায় তারা অনেক অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবে তো সাধারণ জনতার পরিমাণ বেশি, তারপরও তারা একাকী এবং তাদের ভয়ে ভয়ে বাস করতে হয় এ সমাজে।
এর নামে যদি হয় রাজনীতি এবং এ সমস্ত রাজনৈতিক দল যদি দেশ শাসন করে, তাহলে তো সবসময় অবস্থা একই রকম থাকবে। বিগত পলাতক স্বৈরাচারী সরকারের মতোই সবকিছু চলবে, এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি?
অঅরও পড়ুন <<>> কৈ -এর তেলে কৈ ভাজা, জনতার হাতে গজা
পরিত্রাণের উপায় আছে। প্রিয় পাঠক ভাবুন, সাধারণ জনতার পরিমাণ কিন্তু রাজনৈতিক দলের কর্মী সমর্থকদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি, যদিও এ সমস্ত রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা আবার সাধারণ জনতারই একটি অংশ। তাই আপনি, আমি এবং আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, হোকনা বিচ্ছিন্নভাবে তাতে কি, আমরা তো সবাই সমাজেরই অংশ। যখন যে যেখানেই থাকি না কেনো, আমরা যদি আমাদের আদর্শ ও চিন্তা চেতনায় অটল থাকি, তাহলে তো অনেকটাই সমাধান হয়ে যায়। আমরা যেটা ভালো অর্থাৎ ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলি, যদি আমার নিজের আপন এবং কাছের কোন লোকও মন্দ কাজ করে সেটাকে আমরা মন্দ বলি, এবং এটি যদি টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, সিলেট থেকে খুলনা, অর্থাৎ সারা দেশব্যাপী এরকম দেখতে পাওয়া যায়, তবে কিন্তু রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মীবৃন্দ অবশ্যই বুঝতে সক্ষম হবে যে, না সাধারণ জনতার মনে কষ্ট দিয়ে শেষ রক্ষা পাওয়া যাবেনা। কেনোনা সাধারণ জনতার ভোটই তো আমাদের প্রয়োজন। যখন আমরা নির্বাচন করতে যাবো তখন তো আমাদের খারাপ আচরণের জন্য সাধারণ জনতা আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে না। তাছাড়া আমরা রাজনীতি করি তো জনতার ভালোর জন্যই, কেনোনা রাজনীতি হল জনসেবামূলক অনন্য মাধ্যম।
পরিশেষে উপসংহার টানা যায় এভাবে যে প্রিয় রাজনীতিবিদ, আপনারা যারা জনতার সেবার জন্য রাজনীতি করছেন, জন মানুষের চিন্তা চেতনার সামগ্রিক পরিস্থিতি বদলেছে, আপনারা নিজেরা ব্যক্তিগত এবং দলগত ভাবে নিজেদেরকে পরিবর্তন করুন। তা না হলে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে আপামর জনসাধারণের চিন্তা, চেতনার যে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে, তাতে ভবিষ্যতে জনতাকে ব্যবহার করে আপনাদের ব্যক্তিগত এবং দলগত স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য জনতার প্রতিনিধি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে। তাই আসুন নিজেদের বদলাই, দেশ বদলে দিই।
লেখক:
এম এম এ শাহজাহান, প্রকৌশলী
মার্কেটিং অ্যাডভাইজার, ফাইন গ্রুপ।




























