সমাজ ব্যবস্থা বদলানোর মাধ্যমেই জাতীয় মুক্তি
‘পাওয়ার আমার পেছনে ঘুরে’ কি সাংঘাতিক কথা! বাংলাদেশের একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর মুখে । হ্যাঁ, বলছিলাম সুব্রত বাইন, তারই কথা, সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা সবাই জানতে তা পেরেছি।
সন্ত্রাসীদের মর্যাদার স্তর কতটুকু উপরে হলে এরকম কথা তাদের মুখ দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে? এছাড়াও একটি দেশের সামাজিক অবস্থার কতটুকু অধঃপতন ঘটলে রাষ্ট্রের জনগণ এরকম ঘটনার মুখোমুখি হতে পারে?
আমাদের সমাজের অবস্থা এরকম হবেই বা না কেনো? এ ঘটনা কি একদিনে ঘটেছে, নিশ্চয়ই নয়! দিনে দিনে, সপ্তাহ গিয়ে মাস, বছর, যুগ পেরিয়ে লম্বা একটি সময় কয়েক দশক ধরে এরকম অবস্থায় এসে পৌঁছেছে।
সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া স্বভাবের হয়ে থাকে, সেজন্যই তারা সন্ত্রাসী কাজকর্ম করতে পারে, তাদের বিবেক তখন কাজ করে না, বিবেকবর্জিত যেকোনও কাজ তারা করতে পারে, মানুষকে নাজেহাল থেকে আরম্ভ করে খুন পর্যন্ত, সবই তারা ঘটাতে পারে।
সম্প্রতি আরেকটি ঘটনার কথা আমরা জানতে পারি, খোদ বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়র সাহেবের মুখ থেকে। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে নিজ মুখে বলেছেন যে, আলোচিত পুলিশের কর্মকর্তা ওসি প্রদীপ ১০০ টি খুন করেছেন পলাতক সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান কামাল সাহেবের কথায়। এ যদি হয় রাজনীতিবিদ এবং সরকারি পদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাজকর্ম, তাহলে সমাজ নষ্ট না হয়ে কি কোন উপায় আছে?
আমরা উপন্যাসে পড়েছি রাজার মিথ্যে কথা বলতে হয় না। কেননা, তিনি নিজেই তো মহা ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, তার সত্য কথাতেই যেখানে কাজ হয় সেখানে মিথ্যে বলার প্রয়োজনীয়তা বা কতটুকু। ওসি প্রদীপকে দিয়ে একটি মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি নিজের উদ্দেশ্য সাধন করেছেন, তাকে কোন মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়নি বরং কৌশলে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাজ করিয়েছেন। এ ওসি প্রদীপ অমানবিক এ কাজগুলো সেরেছেন ক্রসফায়ারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এখানে তারা সন্ত্রাসী দমন করেছেন আইনের দোহাই দিয়ে, আইনের অপব্যবহার করে। অর্থাৎ আইনের রক্ষকরা ভক্ষক হয়ে তাদের নিয়োগকর্তা বা মালিক, রাষ্ট্রের জনগণকে হত্যা করেছেন তাদের প্রয়োজনে।
আরও পড়ুন <<>> রাজনীতিবিদদের চিন্তার মৌলিক পরিবর্তন আবশ্যক
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে সন্ত্রাসীরা কেন আবার বলছে পাওয়ার বা ক্ষমতা আমাদের পেছনে ঘুরে, মানে তারা পাওয়ারের পেছনে ঘুরে না। ক্ষমতা কাদের হাতে থাকে? ক্ষমতা থাকে সরকারের হাতে, সরকারি কর্মচারীদের হাতে, এ ক্ষমতাধর ব্যক্তিবর্গই আবার সন্ত্রাসীদের পেছনে ঘুরছে। তাহলে সন্ত্রাসীদের হাতে আবার এতো ক্ষমতা কেনো?
সন্ত্রাসীদের ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক, কারণ তারা আইনের ধার ধারে না। নিয়োগকর্তার উদ্দেশ্য বা ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়াই তাদের প্রধানতম কাজ। এখনতো আবার সন্ত্রাসীগিরি বা সন্ত্রাসকর্ম, যা সন্ত্রাসীরা করে থাকে, তা জাতীয় পর্যায়ে থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তাই তো আমাদের দেশীয় সন্ত্রাসীরা বিদেশের মাটি থেকে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে স্বদেশে এসে স্বদেশী কোন নিয়োগকর্তার উদ্দেশ্য সাধন করে থাকে। তাই সম্প্রতি এ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মুখের কথায় সমাজে তারই বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।
সন্ত্রাসীরা যখন রাজনীতি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সমাজের অবস্থা খারাপ না হয়ে ভালো হওয়ার কোন লক্ষণই দেখা যাবে না। তাই পরিচ্ছন্ন রাজনীতি করতে হলে কোন রাজনৈতিক দলে সন্ত্রাসকর্ম করে এরকম কোন কর্মী বা নেতাকে প্রশ্রয় দেয়া উচিৎ হবে না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের রাজনীতির দিকে আমরা চোখ মেললে তাই দেখতে পাই, যারা যত বড় এবং বেশি সন্ত্রাস করতে পারে তাদেরকে বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ সমীহ করেন। ভোটের রাজনীতিতে, তথা চাঁদাবাজি এবং অনন্য অপকর্মের রাজনীতিতে তাদের কাজে লাগান। আর এহেন কার্যকলাপের জন্য সমাজ কলুষিত হতেই থাকে এবং তা হতে হতে বাংলাদেশের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা আজকের এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
তাই পরিশেষে বলতে হয় যে, সুস্থ বিবেকবান সকল নাগরিকের ইচ্ছা হচ্ছে সময় যখন বদলেছে, এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাঠামোগুলো সুন্দরভাবে মেরামত করে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চালনা করাই হোক মুখ্য কাজ। এটিই বর্তমান সমাজের আসল চাহিদা, সকল নাগরিকের আসল ইচ্ছা। সুস্থ সমাজ ব্যবস্থা বিকশিত করার অন্তরায় রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা পূর্ণ কাঠামো এবং কলঙ্কিত কলুষিত সমাজ ব্যবস্থা বদলানোর মাধ্যমেই জাতীয় মুক্তি মিলবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক:
এম এম এ শাহজাহান, প্রকৌশলী
মার্কেটিং অ্যাডভাইজার, ফাইন গ্রুপ।




























