জাতীয় সরকার বনাম দ্রুত নির্বাচন টানাপোড়েন প্রকাশ্যে
নির্বাচন ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে নেপথ্যের অজানা কাহিনী
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের নেপথ্যের নানা অজানা দিক সামনে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের আগেই ছাত্রনেতারা একটি বিস্তৃত জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন, যেখানে সব রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হতো। এ সরকারের লক্ষ্য ছিলো কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার এবং দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় সে পরিকল্পনা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ৫ আগস্ট রাতের এক ভার্চুয়াল বৈঠকে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতীয় সরকারের প্রস্তাবে আপত্তি জানান। তিনি দ্রুত নির্বাচনমুখী একটি ছোট পরিসরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দেন, যেখানে মাত্র সাতজন উপদেষ্টা রেখে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়। ওই বৈঠকেই তিনি তার মেয়ে জাইমা রহমানকেও সমন্বয়কদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন ছাত্র আন্দোলনের অন্যান্য নেতারা, বিশেষ করে নাহিদ ইসলামসহ সমন্বয়করা। তাদের বক্তব্য ছিলো, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য শুধু নির্বাচন নয়; বরং একটি টেকসই ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠন। তারা স্পষ্ট করে দেন, ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের লক্ষ্য ছিলো গভীর সংস্কার, যা তড়িঘড়ি নির্বাচনের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় ৬ আগস্ট সন্ধ্যায়। সরকার গঠন নিয়ে রাজধানীর বঙ্গভবনে প্রায় চার ঘণ্টার একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে সামরিক বাহিনী বৈঠকটি সেনানিবাসে করতে চাইলেও সমন্বয়করা সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈঠকের প্রস্তাব দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে বঙ্গভবনকেই বেছে নেয়া হয়।
এ গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে একদিকে ছিলেন ছাত্রনেতারা ও বিশ্লেষকরা—যাদের মধ্যে ড. আসিফ নজরুল ও অধ্যাপক তানজিমুদ্দিন খান উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে উপস্থিত ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধান ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা। বৈঠকের এক পর্যায়ে যোগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বৈঠকে আসিফ, নাহিদ, ড. আসিফ নজরুল ও অধ্যাপক তানজিমুদ্দিনের বিপরীতে ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধান ও সেনা কর্মকর্তারা এবং শেষ মুহূর্তে যোগ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। আলোচনার মূল বিষয় ছিল প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন এবং সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সামরিক কর্মকর্তারা তার আইনি জটিলতা এবং আওয়ামী লীগ সমর্থকদের অপছন্দের বিষয়টি তুলে ধরে আপত্তি জানান। তাদের আশঙ্কা ছিলো, এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তবে ছাত্র প্রতিনিধিরা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তারা যুক্তি দেন, গণঅভ্যুত্থানের পর পুরোনো রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত ছাত্র প্রতিনিধিদের এ দৃঢ় অবস্থানের কারণেই ড. ইউনূসের নাম চূড়ান্ত হয় বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন আসিফ মাহমুদ।
সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি ছিলো নানা মতপার্থক্য, কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে ভরা—যেখানে দ্রুত নির্বাচন ও গভীর সংস্কারের প্রশ্নে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছিলো।
সবার দেশ/কেএম




























