কারফিউয়ের আড়ালে বিক্ষোভকারীদের ‘শেষ করে দেয়ার’ পরিকল্পনা
‘আজ রাতেই ওদের শেষ করে দিন’—হাসিনার গোপন নির্দেশ ফাঁস
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়েছে। গত বছরের জুলাই মাসে ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের সময় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারফিউ জারির আড়ালে বিক্ষোভকারীদের 'শেষ করে দেয়ার' নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নির্দেশটি তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
সম্প্রতি একটি মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কাছে এ বিষয়ে একটি অডিও রেকর্ডিং পৌঁছেছে, যাতে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং শেখ হাসিনার বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মধ্যে টেলিফোন কথোপকথন রয়েছে।
এ অডিওতে আনিসুল হক সালমান রহমানকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘আজ রাতেই কারফিউ দিয়ে ওদের শেষ করে দিন।’ সালমান রহমানও নিশ্চিত করেন যে, আসাদুজ্জামান খান কামাল তাকেও প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ সম্পর্কে জানিয়েছেন। এ কথোপকথনটি ১৯ জুলাইয়ের আগে বা পরে কোনও এক সময়ে ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যখন ছাত্র আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছিলো। এ ঘটনা গণহত্যার পরিকল্পনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা এখন প্রকাশ্যে এসেছে এবং রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে এ নির্দেশের তাৎপর্য অনেক। সে সময় দেশজুড়ে ছাত্রদের নেতৃত্বে একটি ব্যাপক আন্দোলন চলছিলো, যা সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। জাতিসংঘের তদন্ত রিপোর্ট অনুসারে, এ আন্দোলনের সময় প্রায় ১৪০০ জন নিহত হয়েছেন, যা একটি গণহত্যা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে। এ অডিও ফাঁসের আগে আরও কয়েকটি সংশ্লিষ্ট অডিও প্রকাশ হয়েছে, যা শেখ হাসিনার সরকারের দমনমূলক কৌশলগুলো উন্মোচন করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, শেখ হাসিনার ‘মার্শাল ল’ জারির পরিকল্পনা, তার সহকারী সামরিক সচিব কর্নেল রাজীবকে বিক্ষোভ দমনে সেনাবাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ, সালমান এফ রহমানের অর্থায়নে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের দিয়ে বিক্ষোভকারীদের হত্যা; ১৪ দলীয় জোট নেতা হাসানুল হক ইনুর ফোনালাপে বিক্ষোভকারীদের গণগ্রেফতারের পরিকল্পনা, এবং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ছয়জন নেতাকে গ্রেফতার করে ডিবি কার্যালয়ে নেয়া সম্পর্কে ওবায়দুল কাদের ও ডিবিপ্রধান হারুনের ফোনালাপসহ বিভিন্ন তথ্য আগেই ফাঁস হয়েছে। এসব অডিও থেকে স্পষ্ট হয় যে, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আন্দোলন দমনের জন্য কঠোর এবং মারাত্মক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো।
সালমান এফ রহমান এবং আনিসুল হকের মধ্যে এ ফোনালাপের পূর্ণ বিবরণ নিম্নরূপ:
আনিসুল : হ্যালো, হ্যাঁ বলেন।
সালমান : আপনি ফোন করছিলেন?
আনিসুল : হ্যাঁ, আমি ফোন করেছিলাম।
সালমান : হ্যাঁ।
আনিসুল : এখন কথা হচ্ছে যে, টু স্কুল অব থটস (দুটি বিকল্প চিন্তা)
সালমান : হু-উ-ম।
আনিসুল : একটা হচ্ছে যে, আজকে রাত্রেই কারফিউ দিয়ে এদের (আন্দোলনরত ছাত্রদের) শেষ করে দেওয়া।
সালমান : হু-উ-ম, বলেন।
আনিসুল : আরেকটা হচ্ছে যে, শুনতে পান?
সালমান : একটু হোল্ড করেন। তারপর?
আনিসুল : কে হোল্ড করবে আমি?
সালমান : না, আনিস আপনি বলেন।
আনিসুল : ব্যাপারটা হচ্ছে- আমার মনে হয় এগুলো টেলিফোনে আর বলা উচিত না। আরেক হচ্ছে- ‘গো ফর দ্য রিয়েল হার্ডলাইন।’
আনিসুল : এখন কথা হচ্ছে… ৯ দফা।
সালমান : ৯ দফা... দ্যাট উইল শুড বি।
আনিসুল : দেন মাই কলিগ মি. কামাল (তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল) সেইড দ্যাট ‘নর্থ সাইড’ (উত্তরপাড়া, সেনানিবাস অর্থাৎ আর্মি) হ্যাজ টু গেট ইনভলভ। কিছুক্ষণ থেমে- বুঝতে পারছেন?
সালমান : দ্যাট হি (আসাদুজ্জামান খান কামাল) টোল্ড মি অলসো।
আনিসুল : সো ইউ নো।
সালমান : আর ইউ আর কামিং?
আনিসুল : ইফ আই হ্যাভ টু কাম, আই উইল কাম। ডু ইউ থিংকস আই নিড টু কাম? আই উইল কাম। আই অ্যাম রেডি।
সালমান : নট রিয়েলি বিকজ শি (শেখ হাসিনা) ইজ টংকিং অন দ্য ফোন উইথ এভরিবডি।
আনিসুল : লেট মি স্টে অ্যাট হোম। মাই মবিলিটি, হ্যাভ টু এনশিয়র। অ্যান্ড দেন অ্যাবসুলেটটি নেসাসারি আই কাম। ওকে?
উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ দমনে ব্যর্থ হয়ে শেখ হাসিনার সরকার ১৯ জুলাই রাত ১২টা থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি এবং সেনা মোতায়েন করেছিলো। ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত এ কারফিউ বহাল ছিলো। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর সেনাপ্রধান দেশবাসীর উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, যদি পরিবেশ শান্ত হয়ে যায় কারফিউ আর প্রয়োজন নেই। পরবর্তী সময়ে কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়।
এ ফাঁস হওয়া অডিওগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো এসব তথ্যকে গণহত্যার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে তদন্তের দাবি জানিয়েছে, যখন আওয়ামী লীগের সমর্থকরা এগুলোকে মিথ্যা বা ম্যানিপুলেটেড বলে দাবি করছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট ইতোমধ্যে এ ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা করেছে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে বাংলাদেশ সরকারকে এসব অভিযোগের জবাব দিতে হচ্ছে।
এ ঘটনা শুধু অতীতের একটি অন্ধকার অধ্যায় নয়, বরং বর্তমান রাজনীতিতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলেছে। ভবিষ্যতে এসব অডিওর সত্যতা যাচাই এবং সম্পর্কিত ব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশ পেলে, এটি দেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























