এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে তদন্তের মুখে যেসব প্রভাবশালী
যৌন অপরাধে অভিযুক্ত ও পরে কারাগারে মৃত্যুবরণ করা ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে প্রকাশিত নতুন নথিতে বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ প্রকাশিত প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার এসব নথিতে রাজনীতি, কূটনীতি, ব্যবসা ও অভিজাত সমাজের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। নথিতে নাম থাকায় কেউ কেউ পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, কেউ দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি পেয়েছেন, আবার কারও বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে আনুষ্ঠানিক তদন্ত।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত এ নথিগুলোতে এপস্টেইনের বিশাল নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ এবং পর্দার আড়ালের কর্মকাণ্ডের চিত্র উঠে আসে। মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রো খান্না বলেছেন, এসব নথি মানুষের বিবেক নাড়া দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
নথিতে যাদের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, যিনি এপস্টেইনের সঙ্গে কোনও অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা বিল গেটস প্রকাশ্যে অনুতাপ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ধনকুবের ইলন মাস্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে এর বাইরে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত হলেও প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি নথি প্রকাশের পর সরাসরি বিপাকে পড়েছেন।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রধান নির্বাহী বোরগে ব্রেন্ডের নাম নথিতে উঠে আসার পর তার বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটির গভর্নিং বোর্ড। নরওয়ের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বোরগে ব্রেন্ডে স্বীকার করেছেন, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে নিউইয়র্কে এপস্টেইনের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। যদিও এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেছেন।
নরওয়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব থর্বজর্ন জাগল্যান্ডের নামও এপস্টেইন নথিতে রয়েছে। নথিতে তার সঙ্গে এপস্টেইনের ই-মেইল যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগে নরওয়েজিয়ান পুলিশ তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে।
নরওয়ের কূটনীতিক মোনা জুল, যিনি একসময় অসলো চুক্তির গোপন আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাকেও সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এপস্টেইনের পক্ষ থেকে তার দুই সন্তানের নামে এক কোটি ডলার দেয়ার তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জর্ডানে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে নেয়। তার স্বামী তেরজে রোড-লারসনও ওই সময় অসলো আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ছিলেন।
রোবোটিকস প্রতিষ্ঠান ‘ফার্স্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী ডিন ক্যামেনের নামও নথিতে এসেছে। এপস্টেইন ও তার সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে ক্যামেনের ছবি প্রকাশ পাওয়ার পর তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ থেকে ছুটি নিয়েছেন। ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারের দায়ে কারাগারে রয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী আইন প্রতিষ্ঠান পল ভাইসের দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ব্র্যাড কার্প এপস্টেইন নথিতে নাম আসার পর পদত্যাগ করেছেন। নথিতে দেখা গেছে, নিউইয়র্কে এপস্টেইনের বাড়িতে নৈশভোজে অংশ নিয়ে তিনি একবার লিখেছিলেন, সে সন্ধ্যা তিনি কখনও ভুলবেন না।
স্লোভাকিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাইচাকের নামও নথিতে উঠে এসেছে। এপস্টেইনের সঙ্গে তার বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময় তিনি স্লোভাকিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন।
ফরাসি চলচ্চিত্র প্রযোজক ও সাবেক অভিনেত্রী ক্যারোলাইন ল্যাং নথিতে নাম আসার পর একটি চলচ্চিত্র প্রযোজক সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এপস্টেইনের সঙ্গে শিল্পকর্ম কেনাবেচার একটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো, তবে কোনও বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত হয়নি।
এপস্টেইন নথিতে নাম আসায় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সিনেটর জর্জ মিশেলকেও একটি প্রতিষ্ঠানের সম্মানসূচক অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। উত্তর আয়ারল্যান্ড শান্তিচুক্তির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মিশেলের নাম বাদ দেয়া হয়েছে কুইন্স ইউনিভার্সিটি বেলফাস্টের একটি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এপস্টেইন নথি প্রকাশের পর সামনে আরও পদত্যাগ, তদন্ত ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশ্ব রাজনীতি ও অভিজাত সমাজে এ নথির প্রভাব এখনও পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি।
সবার দেশ/কেএম




























