বিএনপি-জামায়াতের টার্গেট আওয়ামী ভোটার
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণভোট বিতর্ক ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যু ঘিরে যখন রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত, তখনই নির্বাচনি প্রস্তুতির দৌড়ে নেমেছে বিএনপি। দলটির তৃণমূল পর্যায়ে সভা-সমাবেশ, প্রার্থী বাছাই এবং গণসংযোগের কাজ এখন পুরোদমে চলছে।
বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, তিনি নির্বাচনের আগেই দেশে ফিরবেন এবং নির্বাচনেও অংশ নেবেন। তারেক রহমানের এ ঘোষণার পর থেকেই দলটির নেতাকর্মীরা নতুন উদ্দীপনায় মাঠে নেমেছেন।
তবে এবারের প্রস্তুতি এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। মাঠে প্রকাশ্যে নেই আওয়ামী লীগ। রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণ এখনও অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে চলে এসেছে তাদের একসময়ের মিত্র—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াত প্রায় এক বছর আগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করে রেখেছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের আত্মবিশ্বাসও লক্ষ্যণীয়। সাম্প্রতিক জরিপে জামায়াতের সমর্থন বিএনপির কাছাকাছি উঠে আসায় দলটির নেতারা এখন সরাসরি জয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।
জামায়াত শুধু প্রচারণাতেই সীমাবদ্ধ নয়; তারা একটি বিকল্প রাজনৈতিক জোট গঠনেরও চেষ্টা চালাচ্ছে। বিএনপি-বিদ্বেষী এ নতুন জোটের মাধ্যমে তারা নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে।
মাঠের চিত্র: উল্লাপাড়ার উঠান থেকে নদীর পাড়ে
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় গেল সোমবার দেখা যায়, ছোট্ট এক মাঠে জড়ো হয়েছেন বিএনপির প্রায় পঞ্চাশজন কর্মী। উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের নেতাদের আয়োজনে বৈঠকে দলীয় ৩১ দফা কর্মসূচি ও লিফলেট বিতরণ করা হয়। উপস্থিত নেতারা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান।
যদিও আসনটিতে বিএনপি এখনও প্রার্থী ঘোষণা করেনি, জানা গেছে, অন্তত ছয়জন সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে আছেন দলীয় মনোনয়নের আশায়।
উল্লাপাড়া পৌর বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আমরা সব ইউনিয়নে উঠান বৈঠক করছি। প্রচারণা একটু দেরিতে শুরু হলেও এখন সবাই ধানের শীষের পক্ষে একসঙ্গে কাজ করছি। একাধিক প্রার্থী থাকলেও কোন্দল নেই।
অন্যদিকে, একইদিনে করতোয়া নদীর পাড়ে জামায়াত আয়োজন করে নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। বড় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন উল্লাপাড়ার জামায়াত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নেতা রফিকুল ইসলাম খান। কর্মীরা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট চেয়ে স্লোগান দেন।
জামায়াতের উল্লাপাড়া উপজেলা আমীর শাহজাহান আলী জানান, আমরা এক বছর আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছি। ঘরে ঘরে গেছি, সামাজিক কাজ করেছি, ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েছি। এখন ভোট এজেন্টদের প্রশিক্ষণ শেষের পথে।
আত্মবিশ্বাস বনাম বাস্তবতা
উল্লাপাড়ায় এর আগে জামায়াতের কোনও প্রার্থী জয় পাননি। এ আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্র। তবে ৫ আগস্টের ঘটনার পর মাঠে কার্যত আওয়ামী লীগ নেই। এ শূন্যতাকে সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াত।
উপজেলা জামায়াত আমীর শাহজাহান আলী বলেন, আমরা শুধু জিতব না, ইনশাআল্লাহ দুই-তৃতীয়াংশ আসনেও জয়ী হবো।
তাদের আত্মবিশ্বাসের পেছনে তিনটি কারণ তুলে ধরেছেন তিনি—
- জামায়াত ইতিমধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে, বিএনপি এখনো পারেনি।
- বিএনপির ‘চাঁদাবাজি ও দখল রাজনীতি’ ভোটারদের বিমুখ করেছে।
- সাধারণ মানুষ এখন ‘পরিবর্তন চায়’।
তবে বিএনপি এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করছে। বিএনপি নেতাদের মতে, জামায়াতের উত্থান কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উল্লাপাড়া পৌর বিএনপির আহ্বায়ক বলেন, এটা বিএনপির ঘাঁটি। জামায়াতের কোনও অবস্থান নেই এখানে। ধানের শীষের জন্য সবাই একসঙ্গে কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, আগে কিছু চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটলেও এখন সেটা বন্ধ। বরং এখন জামায়াতই এসব করছে।
ভোটের অঙ্কে আওয়ামী লীগ
বিএনপি ও জামায়াতের এ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝখানে নতুন প্রশ্ন উঠেছে—আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা কী করবেন?
সিরাজগঞ্জে ছয়টি সংসদীয় আসনে এখন দুই দলই নিজেদের জয়ের দাবি করছে। অন্য কোনও দলের তেমন কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু স্থানীয়ভাবে আলোচনা হচ্ছে একটাই—আওয়ামী লীগ সমর্থক ভোটারদের ভোট কোথায় যাবে?
বিএনপি মনে করছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা তাদের দিকেই ঝুঁকবেন। সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সহসভাপতি অমর কৃষ্ণ দাস বলেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দেবে। কারণ বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সবাই রাজনীতি করার সুযোগ পাবে।
অন্যদিকে, জামায়াতও মনে করছে আওয়ামী ভোট তাদের পক্ষে যাবে—তবে ভিন্ন কারণে।
উল্লাপাড়ার জামায়াত আমীর শাহজাহান আলী বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা নিরাপত্তা খুঁজছে। ৫ আগস্টের পর অনেকেই হয়রানির শিকার হয়েছে, কিন্তু জামায়াতের কারণে নয়। তাই তারা আমাদেরই নিরাপদ মনে করছে।
শেষ কথা
সিরাজগঞ্জের সোনতলা ব্রিজের কাছে মুদি দোকানি জামান মিয়া বললেন, আওয়ামী লীগ নাই, কিন্তু বিএনপি আর জামায়াত টক্কর হবে।
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আব্দুল হাকিমের মন্তব্য, দুই দলের লোকই ভোট চাইতে আসছে। এবার লড়াইটা হবে জমজমাট।
সব মিলিয়ে সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে এখন নতুন এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে—যেখানে বিএনপি ও জামায়াত উভয়েই নিজেদের ‘প্রধান শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারা আওয়ামী ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারে, তাই-ই নির্ধারণ করবে মাঠের ফলাফল।
সবার দেশ/কেএম




























