শেখা, স্মৃতি আর আনন্দে ভরা মুহূর্ত
ইবি’র সাংবাদিকতা বিভাগ, শ্রীরামপুরে দারুণ এক দিন
দিনটি ছিলো বুধবার। জাকির স্যারের ‘ফিচার, সম্পাদকীয় ও উপ-সম্পাদকীয়’ কোর্সের অংশ হিসেবে আমাদের গন্তব্য প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা ঝিনাইদহের ‘শ্রীরামপুর’। উদ্দেশ্য কেবল ভ্রমণ নয়, বরং হাতে-কলমে ‘ফটো ও ভিডিও ফিচার’ তৈরির এক রোমাঞ্চকর অ্যাসাইনমেন্ট।
সেদিন রওনা হওয়ার কথা ছিলো দুপুর ঠিক দুটোয়। কিন্তু অন্য একটি ক্লাসের কারণে সময় কিছুটা পিছিয়ে গেলো। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১টা ৪০। একদিকে ক্ষুধার তীব্রতা অন্যদিকে হাতে যৎসামান্য সময়; সব মিলিয়ে দ্রুত গতিতে হাঁটা শুরু করলাম ক্যাম্পাসের প্রাণকেন্দ্র ‘ঝালচত্বরের’ দিকে। তাড়াহুড়ো করে খাওয়া সেরে ফ্যাকাল্টি ভবন প্রাঙ্গনে এসে দেখি, বন্ধুরা সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলো। কিছুক্ষণ পর স্যার এলেন এবং আমাদের শ্রীরামপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হলো।
যাত্রাপথে বন্ধুদের গান, হাসি আর আড্ডায় কখন যে পৌঁছে গেলাম টেরই পেলাম না। ভ্যান থেকে নামতেই অভ্যর্থনা জানালো একটি প্রবহমান নদী এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা নান্দনিক এক কাঠের সাঁকো। বাহারি রঙে রাঙানো সে সাঁকোর সৌন্দর্য দেখে সবার ক্যামেরা সচল হয়ে উঠলো। সাঁকোর নিচেই দেখা মিললো এক জেলের; যিনি তার ছোট্ট নৌকায় পরম নিশ্চিন্তে মাছ ধরছিলেন। শীতের স্বচ্ছ পানিতে নদীর তলদেশের জাল ও মাছ ধরার ফাঁদগুলোও যেনো স্পষ্ট ধরা দিচ্ছিলো ক্যামেরার লেন্সে।
সাঁকো পেরিয়ে সামনে এগোতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো ভিন্ন এক জগৎ। দুপাশে দুটি বিস্তৃত মাঠ, তার ঠিক মধ্য দিয়ে চলে গেছে মনোরম এক রাস্তা। রাস্তার দু’পাশের গাছগুলো একে অপরের দিকে এমনভাবে ঝুঁকে পড়েছে, যেন প্রকৃতির তৈরি কোনও এক ‘সবুজ সুড়ঙ্গ’।
নির্দেশনা ছিলো আমাদের সবাইকে আলাদাভাবে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। তাই সবাই নিজ নিজ অ্যাসাইনমেন্টকে পেশাদার করতে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ল। কোনো নতুন জায়গায় গেলে, আমি একটু ভিন্নভাবে সেটাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করি। তাই সবাই যেদিকে দিয়ে শুরু করলো, আমি একটু অন্যদিক থেকে আমার আবিষ্কার অভিযান শুরু করলাম।
অভিযানের শুরুতেই এমন জিনিস আবিষ্কার করলাম, যা কল্পনা করতে পারিনি। তা হলো বিলুপ্তপ্রায় গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ‘গরুর গাড়ি’। একটা সময় এই গাড়ির স্বর্ণযুগ ছিলো। ফসল ঘরে তোলা থেকে শুরু করে বিয়েবাড়ি মোটকথা তৎকালীন সমাজে যাতায়াতের একমাত্র বাহন ছিলো এ গরুর গাড়ি। কিন্তু কালের বিবর্তনে এ ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।

রাস্তা দিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে এগিয়ে চলছি। হঠাৎ চোখে পড়লো রাস্তার ধারের একটি পুকুরে কয়েকজন কিশোর মাছ ধরছে। তা দেখে অজান্তেই নিজের ফেলে আসা শৈশবের কথা মনে পড়ে গেলো। শৈশবের খানিক স্বাদ নিতে তাই আমিও পুকুরপাড়ে নেমে তাদের সাথে কিচ্ছুক্ষণ আনন্দঘন মুহূর্ত পার করলাম। পাশাপাশি তাদের মাছ ধরার কিছু স্থির চিত্র ক্যামেরাবন্দি করলাম।
এরপর পুকুর থেকে রাস্তায় উঠবো এমন সময় দৃষ্টি পড়লো রাস্তার ধারের একটি বড় গাছের মগডালে তৈরি করা ‘ট্রি হাউজের’ ওপর। ছোটবেলায় বাংলা চলচ্চিত্রে প্রথম ‘ট্রি হাউজ’ দেখেছিলাম। তখন থেকেই স্বপ্ন ছিলো বড় হয়ে নিজের জন্য একটা সুন্দর ট্রি হাউজ বানাবো। যাইহোক, তখন সে গাছের নিচে কোনো মই না থাকায়, ট্রি হাউজে ওঠার ইচ্ছা অসম্পূর্ণই রেখেই এগোতে হলো।
রাস্তা ধরে এগিয়ে চলছি এমন সময় কানে ভেসে এলো সেচ মেশিনের শব্দ। ঘুরে তাকাতে দেখি মাঠের দিক থেকে সেই শব্দটা আসছে। ছোটবেলায় এসব মেশিনের পানিতে কত যে গোসল করছি, সাঁতার কেটেছি তার হিসেব নেই। সেচের পানি নালা বেয়ে এগিয়ে চলছে আবাদি জমির দিকে। আমি এগিয়ে গেলাম মেশিনের কাছে। তারপর ঠান্ডা পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে আবার এগিয়ে চললাম খোলা মাঠের দিকে।
সামনে একটু যেতেই দেখলাম একজন কৃষক মহিষ দিয়ে তার জমি চাষ করছেন। বর্তমান ট্রাক্টর আর পাওয়ার টিলারের যুগে এসব লাঙ্গল-জোয়ালের দেখা পাওয়াটা যেন ভাগ্যের ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। মহিষ দিয়ে জমি চাষ দেখে, শৈশবের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। বাবার সাথে সে জমি চাষ আর মইয়ে চড়ার আনন্দের, তা কি কখনও ভোলা যায়।
পাশের একটি জমিতে দেখলাম কয়েকজন নারী ধানের চারা রোপণ করছিলেন। মনে পড়ে গেলো ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে নাচতে নাচতে মাঠে যাওয়ার কথা। কিন্তু এত দুষ্ট ছিলাম, গিয়ে শুধু কাদা মাখামাখি করতাম। বন্ধুদের সাথে কাদা ছোড়াছুড়ি খেলার স্মৃতি তো এখনও জমে আছে মনের কুঠিরে।
বিকেল গড়িয়ে যখন সূর্য পাটে বসার আয়োজন করছে, তখন ফিরতি ডাক পড়লো। ফেরার আগে স্যার সবার জন্য গরম-গরম শিঙাড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। বিকেলের পড়ন্ত রোদে স্যারের দিকনির্দেশনা আর বন্ধুদের আড্ডায় আরও একবার মুখর হয়ে উঠলো শ্রীরামপুরের প্রান্তর। দিনশেষে প্রাপ্তি আর স্মৃতির ঝুলি পূর্ণ করে যখন আমরা ফিরে আসছিলাম, তখন মনে হলো এ অ্যাসাইনমেন্ট কেবল অভিজ্ঞতা নয়, বরং শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক দারুণ সুযোগ।
শিক্ষার্থী, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া জার্নালিজম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
সবার দেশ/কেএম




























