ঝুঁকিতে তৃণমূল কর্মীরা
আওয়ামী লীগে গভীর হতাশা: ভোগ বিলাসে মত্ত শেখ পরিবার
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রভাবশালী নেতারা পরিবার-পরিজনসহ বিদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে আরাম-আয়েশে দিন কাটালেও দেশের ভেতরে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা প্রতিনিয়তই ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় পার করছেন।
আন্দোলনের ডাক, ভিডিও বার্তা ও ‘উসকানিমূলক নির্দেশ’ বিদেশ থেকে পাঠালেও বাস্তবে মাঠে নামছেন এসব তৃণমূল নেতাকর্মীরাই—যাদের অধিকাংশই ইতোমধ্যে গ্রেফতার, জনরোষ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপের মুখে পড়েছেন। ফলে দলজুড়ে দ্রুত বাড়ছে হতাশা, ভাঙন আর ক্ষোভ।
বিদেশে বিলাস, দেশে তৃণমূলে দুশ্চিন্তা
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর শেখ হাসিনাসহ দলের বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় নেতা দেশ ত্যাগ করেন। তারপর থেকে ভারত, কানাডা, লন্ডন ও বিভিন্ন দেশে তারা স্ত্রী–সন্তান, এমনকি তাদের ব্যক্তিগত চাকর-বাকরদেরও নিয়ে নিরাপদে অবস্থান করছেন। দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকালীন সময়ে অর্জিত বিপুল সম্পদের সহায়তায় নতুন পরিবেশে তারা স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন করছেন।
তবে দেশে পড়ে থাকা তৃণমূল নেতাকর্মীদের দিন কাটছে ঠিক উল্টো পরিবেশে। গা-ঢাকা, গ্রেফতার, তল্লাশি, জনরোষ—এসবের মধ্যেই তাদের প্রতিটি দিন অতিবাহিত হচ্ছে। বিদেশে থাকা নেতাদের প্রত্যাশা বা ‘আদেশ’ পালন করতে গিয়ে অনেকেই মামলার আসামি হয়েছেন, কেউ হয়েছেন গণপিটুনির শিকার, আবার কেউ রাজনীতি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন।
ভিডিও বার্তা–নির্ভর রাজনীতি, তৃণমূলে বাড়ছে ক্ষোভ
গত এক বছরে শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, হাছান মাহমুদ, হানিফসহ একাধিক পলাতক নেতা বিদেশ থেকে ভিডিও ও অডিও বার্তার মাধ্যমে ‘কর্মসূচির ডাক’ দিয়েছেন। এসব ডাকের পর ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলের কিছু কর্মী ঝটিকা মিছিল, আগুন, ককটেল বিস্ফোরণে জড়ালেও জনসমর্থন তো দূরের কথা, বরং নিজেরাই গ্রেফতার হয়েছেন বা জনরোষের মুখে পড়েছেন।
তাদের অভিযোগ—যারা বিদেশে আরামে বসে ‘উসকানি’ দিচ্ছেন, দল ক্ষমতায় থাকাকালে সুবিধা নিয়েছেন তারাই। অথচ মাঠে নামতে বলা হচ্ছে সেইসব কর্মীদের, যারা দল ক্ষমতায় থাকলেও মূল্যায়ন পাননি। ফলে তৃণমূলে ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে:
লুটের টাকা নিয়ে আরামে বিদেশে থাকবেন, আর আমরা মাঠে নামবো কেনো? আগে দেশে এসে নিজেরা নেতৃত্ব দিন—ফেসবুকে বহু নেতাকর্মীর এমন প্রতিক্রিয়া এখন নিয়মিত দেখা যায়।
ধানমন্ডি ৩২–এ ঘটনার দায়ও শেখ হাসিনার দিকে
তৃণমূল কর্মীদের বক্তব্য—শেখ হাসিনা ৫ ফেব্রুয়ারি ফেসবুক লাইভে আসবেন এমন প্রচারণার পরেই ধানমন্ডি ৩২–এ বুলডোজার হামলার পরিবেশ তৈরি হয়। তাদের মতে, পালিয়ে গিয়ে দূর থেকে বিবৃতি দেয়ার ফলেই ঐতিহাসিক বাড়িটি কয়েক দফায় জনরোষের মুখে পড়ে। এসব ঘটনায় তৃণমূল আরও নিরুৎসাহিত ও ক্ষুব্ধ হয়।
ব্যর্থ কর্মসূচি ও বাড়তি হয়রানি
১৩ নভেম্বরের লকডাউন ঘোষণা এবং ১৭ নভেম্বরের শাটডাউন কর্মসূচি কার্যত ব্যর্থ হয়। বরং এসব ঘোষণার পর তৃণমূল কর্মীদের নতুন করে তল্লাশি, গ্রেফতার ও নজরদারির মুখে পড়তে হচ্ছে। বহু কর্মী জানিয়েছেন—মাসখানেক আগেও তারা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলেন, এখন আবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
ফরিদপুরে নিক্সন বাহিনীর তাণ্ডব চেষ্টা
বৃহত্তর ফরিদপুরে শেখ হাসিনার ভাগনে মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন বিদেশ থেকে নির্দেশ পাঠান। ১৩ নভেম্বর তার অনুসারীরা অঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে তা নিয়ন্ত্রণে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক মনে করেন—বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের ‘অনলাইন নেতৃত্ব’ মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন। এর ফলে তৃণমূল বারবার সহিংসতা ও ঝুঁকির মুখে পড়ছে, মনোবল ভেঙে যাচ্ছে এবং কেন্দ্রীয়–তৃণমূলের আস্থার ফারাক বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে।
অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর মতে—আওয়ামী লীগ নেতাদের বিদেশ থেকে দেয়া ‘গেরিলাযুদ্ধ’ বা সহিংসতার হুমকি দলের জন্যই সর্বনাশ ডেকে আনছে। দেশে যারা এসব উসকানিতে পা দেবেন, তাদের আইন অনুযায়ীই মোকাবিলা করা হবে।
বিদেশে আশ্রয়ে বিশাল নেটওয়ার্ক
শুধু শেখ হাসিনা নন—তথ্যমতে অন্তত ৭৩৪ জন আওয়ামী নেতা–আমলা ভারতে আশ্রয়ে আছেন। কোলকাতা ও দিল্লিতে আছেন শেখ পরিবারের বড় অংশ, কানাডা–লন্ডন–সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন আরও অনেকে। কেউ কেউ সরকারি পাসপোর্ট নিয়েই দেশ ছাড়তে সক্ষম হন।
উপসংহার
আওয়ামী লীগের তৃণমূলের চোখে এখন স্পষ্ট—বিদেশে নিরাপদে থাকা নেতারা নিজের সুবিধা রক্ষায় আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন, কিন্তু মাঠে নামতে হচ্ছে তাদেরই। এ কারণে তারা সরাসরি বলছেন—এভাবে আর আন্দোলনে নামবেন না। বরং ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফেরাই দলের জন্য একমাত্র টিকে থাকার পথ।
তৃণমূলের মনোবল ভাঙা, নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা এবং শীর্ষ নেতাদের বিদেশে পালিয়ে থাকার বাস্তবতা—সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের সামনে এখন কঠিন অস্তিত্ব সংকট তৈরি হয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























